Monday, March 20, 2017

দাঁতের গোড়া ফুলে গেলে


দাঁতের গোড়া ফুলে গেলে

যখন শরীরের কোনো অংশ ফুলে যায়, সাধারণত সেখানে পুঁজ জমা
হয়। এটি অ্যাবসেস বা ফোড়া। ত্বকে যখন ফোড়া হয় তখন অনেক
ক্ষেত্রেই তা পেকে গিয়ে সাদা হয়ে আসে। দাঁতের গোড়ায়ও এই
অ্যাবসেস বা ফোড়া হতে পারে।
সাধারণত আগে থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত কোনো দাঁতের গোড়ায় এই
ফোড়া দেখা যায়। তবে এটা এক দিনে বা হঠাৎ করে হয় না। এর জন্য
অনেক দিন সময় লাগে। সাধারণত দাঁত ক্ষয়রোগ বা ক্যারিজে আক্রান্ত
হওয়ার পরও যথাযথ চিকিৎসা না করলে বা যথাসময়ে চিকিৎসা না করালে,
আঘাতে দাঁতের শিকড় বা শিকড়ের অংশবিশেষ ভেঙে গেলে,
যথাযথভাবে দাঁত পরিষ্কার না করলে এ ধরনের ইনফেকশন হয়।
অ্যাবসেস হলে ওই স্থানটি ফুলে যায়, ব্যথা হয়। কখনো কখনো
ফোলা স্থান থেকে পুঁজও বের হয়।
সাধারণত দাঁতে দুই ধরনের অ্যাবসেস বা ফোড়া দেখা যায়। পেরিএপিকাল
অ্যাবসেস ও পেরিওডন্টাল অ্যাবসেস। পেরিএপিকাল অ্যাবসেসে
দাঁতের শিকড়ের চারপাশে ফুলে যায়, তীব্র ব্যথা হয় এবং দাঁতের চিকিৎসা
(রুট ক্যানাল বা দাঁত তুলে ফেলা ইত্যাদি) না করা পর্যন্ত ইনফেকশন ভালো
হয় না।
অন্যদিকে পেরিওডন্টাল অ্যাবসেস দাঁতের চারপাশে থাকা গাম বা
মাংসপেশির ইনফেকশন। এটি সহজেই চিকিৎসাযোগ্য।
যেভাবে অ্যাবসেস তৈরি হয়
পেরিওডন্টাল অ্যাবসেসের ক্ষেত্রে প্রথমে দাঁত ও মাড়ির মাঝে
খাদ্যকণা জমে। এগুলো পরিষ্কার না করা হলে তা একটা সময়ে পচে যায়।
এ সময় এখানে লাখ লাখ ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ ঘটে। বিভিন্ন প্রজাতির
ব্যাকটেরিয়া খুব দ্রুত শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল
করে দেয়। অন্যদিকে পেরিএপিকাল অ্যাবসেস সাধারণত শুরু হয় দাঁতের
ক্যারিজ বা ক্ষয়রোগ থেকে। ক্যারিজ যখন দাঁতের এনামেল ও ডেন্টিন
ক্ষয় করে দন্তমজ্জা বা পাল্পে প্রবেশ করে তখন প্রথমে দাঁতে
ব্যথা হয়। এ সময় ক্যারিজ বা ক্ষয়রোগের কারণ যে ব্যাকটেরিয়াগুলো
তারাও দ্রুত পাল্পে প্রবেশ করে এবং ধীরে ধীরে পাল্প পচিয়ে
ফেলে। এই পচে যাওয়া পাল্প বা পাল্পপুঁজ তখন দাঁতের শিকড়ের
ভেতরে থাকা নালি দিয়ে গোড়ায় চলে যায়। সেখানে থাকা অস্থিকেও
ব্যাকটেরিয়া আক্রমণ করে এবং সেখানেও পচন শুরু হয়। দাঁত যেহেতু
হাড়ের ভেতর প্রতিস্থাপিত থাকে, তাই দাঁতের গোড়ায় পচন বা পুঁজ হওয়া
মানে হাড়েও ইনফেকশন ছড়িয়ে যাওয়া। ধীরে ধীরে দাঁতের
গোড়ার চারপাশে থাকা হাড় যখন পচে গিয়ে যখন তা নরম মাংসে আসে
তখনই আমরা ওই স্থানটি ফুলে যেতে দেখি।
যেহেতু ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণে অ্যাবসেস হয়, তাই উভয় ধরনের
অ্যাবসেসেই ডেন্টাল চিকিৎসা ছাড়াও অ্যান্টিবায়োটিক সেবনের
প্রয়োজন হয়। তবে পেরিওডন্টাল অ্যাবসেস পেরিএপিকাল
অ্যাবসেসের তুলনায় কম বিপজ্জনক। পেরিএপিকাল অ্যাবসেস যথাসময়ে
চিকিৎসা না করলে, যথাযথ অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ না করলে
আশপাশের স্থানে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং লাডউইগ অ্যানজাইনার মতো
কিছু রোগের কারণ হয়। লাডউইগ অ্যানজাইনা এমন একটি রোগ, যেখানে
গলার চারপাশে আকস্মিক পুঁজ জমে ফুলে যায় এবং রোগী নিঃশ্বাস নিতে
পারে না। জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা না নিলে রোগীর মৃত্যু পর্যন্ত ঘটতে
পারে।
অনেক সময় চিকিৎসক অ্যাবসেস বা ফুলে যাওয়া স্থান থেকে জমে থাকা
পুঁজ বের করে তারপর মূল চিকিৎসায় যান। জমে থাকা পুঁজ বের করলে
ব্যথা কমে আসে। কখনো কখনো কিছু অ্যাবসেস বারবার হয় এবং
অ্যান্টিবায়োটিকেও ভালো হতে চায় না। এসব ক্ষেত্রে ওই
অ্যাবসেস থেকে পুঁজ সংগ্রহ করে তা কালচার পরীক্ষায় পাঠানো হয়।
কালচার পরীক্ষার ফল দেখে পরবর্তী চিকিৎসা দেওয়া হয়।

we take care of your smile.............

Saturday, March 18, 2017

হৃদরোগ সংক্রান্ত কিছু সাধারণ উপদেশ

হৃদরোগ সংক্রান্ত কিছু সাধারণ উপদেশ নীচে দেওয়া হল -
· সকল প্রকার তামাক এবং তামাকজাত দ্রব্য গ্রহন থেকে বিরত থাকুন।
· অতিরিক্ত তেল অথবা চর্বি যুক্ত খাবার গ্রহন থেকে বিরত থাকুন,স্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহন করুন।
· আপনার খাদ্য তালিকায় তাজা শাকসব্জি এবং ফল অন্তর্ভুক্ত করুন।
· তরকারিতে পরিমিত লবন খান, খাবারে বাড়তি লবন মিশিয়ে খাওয়া বন্ধ করুন।
· চিনি বা মিষ্টি জাতীয় খাবার যত সম্ভব এড়িয়ে চলুন।
· ঘাম ঝরানো শারীরিক পরিশ্রম করুন, হাটার সময় দ্রুত হাটুন। সব সময় লিফট ব্যবহার না করে যতদুর সম্ভব সিড়ি বেয়ে উঠার অভ্যাস করুন।
· উচ্চরক্তচাপ বা হাইপারটেনশন (ব্লাড প্রেসার) এবং ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে রাখুন।
· শরীরের বাড়তি ওজন কমিয়ে ফেলুন এবং ওজন নিয়ন্ত্রনে রাখার চেষ্টা করুন।
· রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা নিয়ন্ত্রিত রাখুন, লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষাটি করে জেনে নিন আপনার রক্তে কোন ধরনের চর্বি বেশী আছে, সেই অনুযায়ী চিকিৎসা নিন এবং খাদ্য তালিকা তৈরী করুন।
· যাদের বাবা/মা বা বড় ভাই বোন দের (পারিবারিক) হৃদরোগ আছে তারা অতিরিক্ত সাবধানতা অবলম্বন করুন এবং নিয়মিত রক্তচাপ, রক্তের চর্বি, ডায়াবেটিস পরীক্ষা করে নিজের অবস্থান জেনে নিন।
· মানসিক চাপ থেকে মুক্ত থাকার চেষ্টা করুন, মানসিক চাপ হৃদরোগ ঘটায়। সৃষ্টিকর্তার উদ্দেশ্যে দৈনিক নিয়মিত প্রার্থনা করু্ন। সম্ভব হলে মেডিটেশন করে দেখতে পারেন।
· দৈনিক অল্প কিছু সময় শিশু এবং বয়োবৃদ্ধদের সাথে কাটানোর চেষ্টা করুন, বন্ধুদের সাথে প্রানখোলা আড্ডা মানসিক প্রশান্তি আনতে পারে। সব সময় হাসি খুশী থাকবার চেষ্টা করুন।
· দৈনিক পরিমিত নিদ্রা গ্রহন করুন, লক্ষ্য রাখুন আপনার দৈনন্দিন জীবনে যেন যথেষ্ট বিশ্রাম এবং বিনোদনের সূযোগ থাকে।
· ছোট শিশুদের গলা ব্যথা হলে বা বাতজ্বর হলে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।
· করোনারি বা অন্যান্য জটিল হৃদরোগ হবার সুনির্দিষ্ট কোন বয়স নেই, তাই সব বয়সেই হার্টের যন্ত নেবার প্রতি সচেষ্ট হন। সন্দেহ হলে চিকিৎসকের স্মরণাপন্ন হোন।

ইশকেমিক (Ischaemic) হার্ট ডিজিজ

হার্ট ব্লক হয়েছে বললেই আমাদের মনে যে রোগটির ছবি ফুটে উঠে তা হলো আসলে ইশকেমিক ডিজিজ। হার্ট ব্লক নামক প্রচলিত শব্দটি কিন্ত এই রোগের ক্ষেত্রে ভুল নামকরণের শিকার, কারণ হার্ট ব্লক নামে সত্যিই একটি হৃদ রোগ আছে যার সাথে এই রোগের মিল খুব সামান্যই। তবে হার্ট এর ধমণী তে ব্লক (করোনারি আরটারী স্টেনোসিস) হয়েছে বললে সেটা কিন্ত এই রোগটিকেই বোঝায়। তাই পাঠক এই ক্ষেত্রে একটু যত্নবান হবেন বলে আশা রাখবো। মেডিকেল পরিভাষায় একে করোনারি আর্টারি ডিজিজ বলা হয়।
ধমণীর ব্লক কীঃ হৃদপিন্ড শরীরের সর্বত্র রক্ত সরবরাহ করে, এই প্রবাহিত রক্তের কাজ খুব সহজ করে বললে হবে সর্বত্র পুষ্টির যোগান দেয়া। হৃদপিন্ডের নিজেরও পুষ্টির প্রয়োজন আছে আর তা আসে মোটামুটি মাঝারী মাপের তিনটি ধমণীর সাহায্যে। এদের নাম যথাক্রমে ডান পাশে আর,সি,এ (রাইট করোনারি আরটারি), মাঝে এল,এ,ডি (লেফট এন্টেরিয়র ডিসেন্ডিং), এবং যেটি হৃদপিন্ড কে ঘুড়ে আসে তার নাম এল,সি,এক্স (লেফট সারকামফ্লেক্স) আরটারি। কোনো কারণে যদি এসব ধমণী সরু হয়ে যায় বা বন্ধ হয়ে যায় তাহলে করোনারি আরটারীর স্টেনোসিস হয়েছে বা ব্লক হয়েছে শব্দ দুটি ব্যবহৃত হয়। সাধারণত ধমণীর গায়ে চর্বি জমে তা ক্রমান্বয়ে সরু হতে থাকে। এটা যদি শতকরা ৫০ ভাগ এর বেশি হয়ে যায় সেক্ষেত্রে হৃদপিন্ডের রক্ত প্রবাহ মাত্রাতিরিক্ত কমে যেতে থাকে এবং রোগী সামান্য পরিশ্রমেই বুকে ব্যথা অনুভব করতে পারেন।
হার্ট এটাক / এমআই / স্ট্রোকঃ হার্ট এটাক রোগটিকে ভুলবশত স্ট্রোক বলা হয়ে থাকে। স্ট্রোক মস্তিস্কের রক্তক্ষরণ জাতীয় রোগ আর হার্ট এটাক হৃদপিন্ডের একটি রোগ, যার মেডিকেল পরিভাষা হল মায়কার্ডিয়াল ইনফার্কশন, ছোট্ট করে একে বলা হয় এম,আই। হার্ট এর ধমণী গুলো সরু হয়ে গেলে বা বন্ধ হয়ে গেলে রক্ত প্রবাহ আশংকা জনক হারে কমে যায় এবং হার্টের কোষ গুলো মৃত্যু বা ধ্বংসের দিকে ধাবিত হয়- এর ই নাম ইশকেমিয়া। কেতাবী নাম মায়কার্ডিয়াল ইশকেমিয়া। ইশকেমিয়া হলে বুকে তীব্র চাপ ও ব্যাথা অনুভুত হয় তখন এই সমস্যাটিকে বলে এনজাইনা পেক্টোরিস। এনজাইনা শব্দের বাংলা অর্থ ব্যাথা আর পেক্টরিস এর অর্থ বুক। যদি ইশকেমিয়া চলতেই থাকে তবে হার্ট এর কোষ গুলো একসময় মারা যায়, এই অবস্থাটির নামই মায়কার্ডিয়াল ইনফার্কশন বা এম,আই- যা আমরা প্রচলিত অর্থে হার্ট এটাক হিসেবে চিনি।
লক্ষনঃ ইশকেমিয়া হলে রোগীর বুকের বাম দিকে প্রচন্ড ব্যাথা বা এনজাইনা হয় এবং রোগী বুকে তীব্র চাপ অনুভব করে। অনেক রোগীই অভিযোগ করে যে তার বুকের উপর ভীষন ভারী একটা কিছু চেপে বসে আছে। ব্যাথার তীব্রতা বুকে বেশী থাকলেও এটা বুক থেকে গলা, গাল, মাড়ি, কান, বাম হাত এবং আশে পাশে ছড়িয়ে পরতে পারে। একে রেফার্ড পেইন বলা হয়। বুকের ব্যাথা ১ থেকে ৩ মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে, তবে এটা কখনই ৩০ সেকেন্ড সময়ের কম দৈর্ঘের হয়না। আবার ১৫ মিনিটের বেশী স্থায়ী হওয়ার নজিরও খুব কম। এনজাইনা বা ব্যাথা শুরু হয় সাধারণত কোনো একটা পরিশ্রমের কাজ করার সময় যেমন দৌড়ানো বা জোরে হাটা ইত্যাদি। তবে পেট ভরে খাবার খাওয়া, যৌন ক্রিয়া এমনকি হঠাৎ রেগে যাওয়া বা উত্তেজিত হয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ও এনজাইনা শুরু হয়ে যেতে পারে। ব্যাথার সাথে রোগীর অন্য উপসর্গ যেমন শ্বাসকষ্ট, পেট ফাপা লাগা, অস্থির লাগা, বুক ধড়ফর করা ইত্যাদিও থাকতে পারে। পরিশ্রম বন্ধ করে বিশ্রাম নিলে এই ব্যথা সাথে সাথে সাময়িক ভাবে কমে যেতে পারে।
রোগ নির্ণয়ঃ বুকের ব্যাথার কারণ হিসেবে এনজাইনা বা এম,আই সন্দেহ হলে প্রথম যে পরীক্ষাটি করা হয় তা হলো একটি ১২ লিডের ইসিজি। ব্যাথার শুরুর দিকে ইসিজি স্বাভাবিক ও আসতে পারে, এজন্য পর্যায়ক্রমে বেশ কয়েকবার ইসিজি করা লাগতে পারে। এর পর ও যদি ইসিজি স্বাভাবিক আসে এবং এনজাইনা হবার সন্দেহ থাকে সেক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকগন রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে হার্ট এর এনজাইম এর মাত্রা দেখে এই রোগ নিশ্চিত করেন। প্রধানত ট্রপনিন আই এবং সি,কে,এম,বি এনজাইম দুটো দেখা হয়, এছাড়া অন্য এনজাইম ও দেখার প্রয়োজন হতে পারে। এনজাইনা বা এম,আই এর কারণ জানার চুড়ান্ত পরীক্ষা হলো এনজিওগ্রাম করা। সিটি স্ক্যান করে (সিটি এনজিওগ্রাম) অথবা পা কিংবা হাতের ধমনীতে বিশেষ ধরনের ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে- দুভাবেই এনজিওগ্রাম করা যায়। তবে শেষের পদ্ধতিই বেশী কার্যকর। কোনো কোনো রোগী আছেন যাদের মাঝে মাঝে কাজের মধ্যে বুকে ব্যাথা হয় কিন্ত স্বাভাবিক অবস্থায় হয়না এবং ইসিজি করলেও ধরা পড়েনা তাদের ক্ষেত্রে স্ট্রেস টেস্ট বা ইটিটি পরীক্ষা করে রোগ নির্ণয় করতে হয়।
চিকিৎসাঃ করোনারি আর্টারি ডিজিজ বা ইশকেমিক হার্ট ডিজিজ এর চিকিৎসা অবশ্যই হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ (কার্ডিওলজিস্ট) এর তত্ত্বাবধানে করা উচিত। এর কোনো বিকল্প নেই। কারণ কেবল হৃদরোগ বিশেষজ্ঞই রোগীর সঠিক অবস্থা বিবেচনা করে আদর্শ চিকিৎসা দিতে পারেন। সহজ করে বললে এনজাইনা জাতীয় রোগে তারা প্রথমেই যে ঔষুধ গুলো দিয়ে থাকেন তার মধ্যে একটি হলো নাইট্রোগ্লিসারিন যা স্প্রে করে, শিরায় অথবা ট্যাবলেট হিসেবেও দেয়া হয়। এছাড়াও রক্তের প্লাটেলেট বিরোধী এসপিরিন বা ক্লোপিডোগ্রেল, উচ্চরক্ত চাপ নিয়ন্ত্রনের অসুধ, মরফিন জাতীয় শক্তিশালী ব্যাথা নাশক এবং রক্ত তরলকারি হেপারিন বা ইনোক্সাপারিন ও দেয়া হয়। কার্ডিওলজিস্ট অনেক সময় রোগীর অবস্থা বিবেচনা করে রক্ত তরলকারি ইনজেকশন স্ট্রেপটোকাইনেজ বা এল্টেপ্ল্যাজ জাতীয় অসুধ ও ব্যবহার করে থাকেন। তবে ইশকেমিক হার্ট ডিজিজ এর চুড়ান্ত চিকিৎসা হলো প্রথমে এনজিওগ্রাম করে কোন ধমনীতে স্টেনোসিস আছে তা নির্ণয় করা এবং সেই অনুযায়ী এনজিওপ্লাস্টি করা বা ব্লক সরিয়ে সে স্থানে স্টেন্ট বসিয়ে দেয়া(যা প্রচলিত আছে রিং পরানো নামে)। অনেক সময়ই স্টেন্ট বসানো সম্ভব হয়না অথবা যৌক্তিক হয়না সেক্ষেত্রে অবশ্যই সিএবিজি বা বাইপাস অপারেশন (প্রকৃত নাম CABG- Coronary Artery Bypass Graft) করে রোগীর স্থায়ী রোগ মুক্তি ঘটান হয়।

সাইনুসাইটিস (Sinusitis)

মুখমন্ডল ও মস্তিস্কের হাড়কে হাল্কা করার সুবিধার্তে এর ভেতরে কিছু বায়ুকুঠুরি আছে যার নাম সাইনাস (Sinus)আর এর প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন এর জন্য যেই রোগটি হয় তাই আমাদের অতিপরিচিত সাইনুসাইটিস(Sinusitis)
মাথার হাড়ে এমন চারটি সাইনাস রয়েছেএর মধ্যে ম্যাকজিলারি ওফ্রন্টাল সাইনাস দুটি বড় তাই রোগ ও এতে বেশী হয়। এরা নাকের গর্তে গিয়ে শেষ হয়। মাথার হাড়ের ওজন কমানো ছাড়াও মানুষের মুখের শব্দকে ভারী এবং কিছুটা নাসিকাময় করায় এদের ভূমিকা আছে।
সাধারণত ব্যাক্টেরিয়ার আক্রমনেই সাইনুসাইটিস হয়ে থাকে। তবে নাকে আঘাত পাওয়াএলার্জিঠান্ডা লাগাধুলাবালুনাকের হাড় বাকা হয়ে যাওয়ানাকে টিউমার হওয়া নানাবিধ কারন গুলো এ রোগের প্রকোপ অনেকগুনে বাড়িয়ে তোলে।
নাক দিয়ে অবিরত পানি পরা বা হটাৎ করে নাক বন্ধ হয়ে যাওয়াটা সাইনুসাইটিস রোগের একদমই পরিচিত একটি উপসর্গ। সেই সাথে তীব্র-দীর্ঘ ও বিরক্তিকর মাথা ব্যথা তো রয়েছেই, সাইনাস গুলোর ঠিক উপরেও একটা চাপা ব্যথা থাকে। মাথা ভারী ভারী লাগা ও সবকিছু খাবারের স্বাদ নষ্ট হয়ে যাওয়া এরোগটিকে নানাভাবে তীব্র অস্বস্তিকর একটি রোগে পরিনত করে। অনেক সময় এর সাথে জর, গা ম্যাজ ম্যাজ করা এবং মানসিক অবসাদ যোগ হয়ে রোগীকে ভীত করে তোলে।
অনেকের এই রোগটি বছরে কয়েকবার হয়ে থাকে, বিশেষ করে যারা বিভিন্ন এলার্জিতে ভোগেন, তাই এরোগ এড়াতে ঐসব ব্যাপারে বিশেষ সাবধান হওয়া আবশ্যক। শুষ্ক, খোলামেলা এবং যথেষ্ট আলো বাতাস আছে এমন ঘরে বসবাস সাইনুসাইটিসের সম্ভাবনা অনেকাংশে হ্রাস করে।
এতো কিছুর পরও যদি এরোগ হয়েই যায় তাহলে নাক,কান,গলা বিশেষজ্ঞের স্মরণাপন্ন হতে হবে। প্রয়োজনীয় এন্টিবায়োটিকহিস্টাসিন জাতীয় কিছু অসুধ এবং প্যারাসিটামল এরোগে বেশ কার্যকারিতার দাবী রাখে। সেই সাথে নাকে বাষ্পের ভাপ নেয়াপুষ্টিকর ও ভিটামিনযুক্ত খাবার খাওয়া এবং বিশ্রাম নেয়া এরোগে বেশ আরাম দেয়। 

থাইরোগ্লোসাল সিস্ট (Thyroglossal Cyst)

থাইরোগ্লোসাল সিস্ট হলে গলার ঠিক মাঝ বরাবর ছোট্ট একটি অংশ ফুলে থাকে। আসলে এই ফুলে থাকা অংশটিই হলো সিস্ট। এর ভেতরে পানির মতো তরল থাকে। সাধারনত শিশুদের জন্মের পরে এই সমস্যাটি দেখা দিতে পারে তবে পরিণত বয়সেও এটি দেখা দিতে পারে। এটা আসলে একটি জন্মগত ত্রুটি, থাইরয়েড হরমোন গ্রন্থিটির নিচে নামার পথটি রয়ে গেলেই এই সমস্যা দেখা দেয়। শিশু ঢোক গেলার সময় বা জিহবা বের করলে এই সিস্টটি গলার সামান্য উপরের দিকে উঠে আসে, এটা দেখেই চিকিৎসকেরা এই রোগটি সনাক্ত করে থাকেন। এটির একমাত্র চিকিৎসা হলো অপারেশন করে সিস্ট টি ফেলে দেয়া। এই অপারেশনের নাম সিস্ট্রাঙ্ক অপারেশন। শিশু সার্জন বা নাক কান গলা সার্জন উভয়েই এই অপারেশন করতে অভিজ্ঞ বলে ধরে নেয়া হয়।

টনসিলাইটিস (Tonsillitis)

বাচ্চাদের গলায় ব্যথা হলেই আমরা বলে দেই - "তোমার তো টনসিল হয়েছে"। অমনিই জোটে এটা খাবেনা, ওটা করবেনা এমন একগাদা উপদেশ। তো এই টনসিল টা কী? টনসিল হলো আমাদের শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার একটা অংশ এবং আমাদের মুখের ভেতরেই চারটি গ্রুপে তারা অবস্থান করে। এদের নাম যথাক্রমে লিঙ্গুয়াল, প্যালাটাইন, টিউবাল এবং এডেনয়েড। এই টনসিল গুলোর কোনো একটির প্রদাহ হলেই তাকে বলে টনসিলাইটিস। টনসিল বলতে আমরা সচরাচর যা বুঝি তা কিন্ত আসলে টনসিলাইটিস। আর প্যালাটাইন টনসিলটিই প্রদাহ সৃষ্টি করে আমাদের গলা ব্যথা জাতীয় সমস্যায় ফেলে সবচেয়ে বেশী।
টনসিলাইটিস যে শুধু বাচ্চাদের হয় তা নয় এটা বাচ্চাদের বেশী হলেও যে কোনো বয়সেই হতে পারে। এ রোগটি হলে গলা ব্যথা হয়, সেই সাথে তীব্র জর ও থাকে, বাচ্চারা কিছু খেতে চায়না, গলার স্বর পরিবর্তিত হয়ে কিছুটা ভারী হয়ে যায়, সেই সাথে মুখে দুর্গন্ধ, গা ম্যাজ ম্যাজ করা, মাথা ব্যথা, কানে ব্যথা থেকে কোষ্ঠ কাঠিন্য পর্যন্ত হতে দেখা যায়। অনেক সময় গলার বাইরের দিকে দুপাশে বড়ই বিচির মতো দুটি দানা ফুলে উঠতেও দেখা যায়, অনেকে এগুলোকে টনসিল মনে করলেও এরা কিন্ত টনসিল নয়। রোগী বড় করে মুখ হা করলে ভেতরের দিকে যে দুটি বড় দানার মতো দেখা যায় তাই হলো টনসিলাইটিস এ আক্রান্ত টনসিল।
টনসিলাইটিস হলে রোগীকে বিশ্রামে থাকতে হয়। প্যারাসিটামল জাতীয় অসুধ এর ব্যথা ও জ্বর নিবারনে কার্যকরি ভূমিকা রাখে। হাল্কা কুসুম গরম পানিতে সামান্য এন্টিসেপ্টিক বা লবন মিশিয়ে গড়গড়া করলে রোগী আরাম বোধ করে। অনেক রোগীকেই আদা ও লেবু দিয়ে তৈরী র চা (Raw Tea) পান করলে স্বস্তি বোধ করতে দেখা যায়। ভিটামিন সি ও এই রোগের উপশমে অবদান রাখে। নাক কান ও গলা বিশেষজ্ঞগন এর চিকিৎসায় সবচেয়ে পারদর্শী। তারা এ রোগের জন্য ৫ থেকে ৭ দিনের এন্টিবায়োটিকের কোর্স দিয়ে থাকেন যা গ্রহনে অধিকাংশ রোগীই দ্রুত সুস্থ হয়ে যায়। তবে কারো যদি বার বার টনসিলাইটিস হয় বা এর জন্য অন্য কোনো জটিলতার সৃষ্টি হয়ে থাকে সে ক্ষেত্রে টনসিল কেটে ফেলে দিতে হয়, একে টনসিলেকটমি অপারেশন বলে।
টনসিলেকটমি অপারেশন করিয়ে নিলে কারো আর টনসিলাইটিস হবার কোনো সম্ভাবনা থাকেনা। তাই যারা টনসিল এর সমস্যার জন্য বারবার বিপর্যস্ত হতে চাননা তারা এই স্থায়ী সমাধানের ব্যপারে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

এডেনয়েড (Adenoid)

এডেনয়েড একধরনের টনসিল, এর অবস্থান নাকের গভীরে একদম পেছনের দিকে গলার উপরিভাগে। এর প্রদাহ বা ইনফ্লামেশন হলে এটা বড় হয়ে যায় এবং নানাবিধ সমস্যা ও উপসর্গের আবির্ভাব ঘটে। বাচ্চাদের এডেনয়েড বড় হয়ে গেলে তাদের শ্বাসকষ্ট হয় এবং তাদের নাকের বদলে মুখ (Mouth breather) দিয়ে শ্বাস নিতে দেখা যায়। এজন্য বাচ্চারা খেতে চায়না এবং তাদের স্বাস্থ্য খারাপ থাকে। এডেনয়েড বড় হলে গলার স্বর পরিবর্তিত হতে পারে এবং বাচ্চা কানে কম শোনা শুরু করে। এ ধরনের শিশুদের কানপাকা (Otitis Media) রোগ হবারও সুযোগ থাকে। অনেকদিন ধরে এ রোগে ভূগতে থাকলে এক সময় শিশুটির মুখ দিয়ে সবসময় লালা ঝরে পরতে থাকে(Drooling)। দাঁত উচু নিচু হয়ে যাওয়া, নাক বোঁচা হয়ে যাওয়া, চেহারা বোকা বোকা হয়ে যাওয়া, রাত্রে বিছানায় প্রসাব করে দেয়া (Enuresis) এসব উপসর্গও কালক্রমে একসময় শিশুটির কষ্টের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
নাক কান গলা বিশেষজ্ঞগণের তত্ত্বাবধানে এই রোগের চিকিৎসা করানো উচিত। রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে চিকিৎসা করালে এন্টিবায়োটিক, নাকের ড্রপ ও হিস্টাসিন জাতীয় অসুধ সেবনে এই রোগ নিয়ন্ত্রনে থাকে। সেই সাথে শ্বাসের কিছু ব্যয়াম করা, পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, খোলামেলা পরিবেশে থাকা ইত্যাদি বিষয় গুলোও রোগীকে সুস্থ্য রাখতে সাহায্য করে। এডেনয়েড খুব বড় হয়ে গেলে অপারেশন(Adenoidectomy) করানো ছাড়া এটা ভালো হয়না। যে সকল শিশুর এডেনয়েড বড় হবার কারনে মুখ দিয়ে শ্বাস নিতে হয় বা শ্বাস কষ্ট হয় তাদের ক্ষেত্রে অপারেশন করিয়ে নেয়াই বুদ্ধিমানের কাজ হবে

ব্রাঙ্কিয়াল ফিস্টুলা (Branchial Fistula)

অনেক সময় শিশুদের এমনকি কৈশোরেও গলার নিচের দিকে প্রায় মাঝ বরাবর একটি ছোট্ট ছিদ্র দেখা যায়। এটি দিয়ে ক্রমাগত পানি অথবা পুঁজ মিশ্রিত পানি বের হতে দেখা যায়। জন্মগত এই ত্রুটিটির নামই ব্রাঙ্কিয়াল ফিস্টুলা। এটা লম্বা একটা নালীর মতো সরু একটি পথ যার ভেতরের মুখটি থাকে গলার ভিতরে, জিহবার গোড়ার দিকে এবং বাইরের মুখটি থাকে গলার বাইরের দিকে চামড়ায়। ব্রাঙ্কিয়াল ফিস্টুলা অনেক সময় গলার দুই পাশেও হতে পারে।
বেশ অস্বস্তিকর এবং বিরক্তিকর এই রোগটি থেকে শিশুকে মুক্তি দিতে হলে বাবা-মা এর অবশ্যই একজন অভিজ্ঞ শিশু সার্জন অথবা নাক, কান, গলা সার্জন এর সাথে যোগাযোগ করা উচিত। অপারেশন করে ঐ সরু অস্বাভাবিক পথটি ফেলে দেয়াই হলো এই রোগের একমাত্র সফল চিকিৎসা।

কেমোডেকটোমা / নিউরোজেনিক টিউমার

খুব উচূ স্থানে বা পাহাড়ে বসবাস করে এমন লোকজনেরই সাধারনত এই টিউমারটি হতে দেখা যায়। ৪০ বছরের আগে এই টিউমার হবার সম্ভাবনাও খুব কম। গলার মাঝামাঝি, যে কোন এক পাশে এই টিউমারটি হতে দেখা যায়। এটা নিরীহ শ্রেনীর একটি টিউমার আর তাই অনেকদিন ধরে খুব অল্প অল্প করে এটা বড় হতে থাকে। বড় হলে এটা জলপাই এর মতো হয় এবং ধরলে রবারের মতো হাল্কা শক্ত মনে হয় এবং নাড়ির স্পন্দন এর সাথে সে লাফাতে থাকে।
একে অনেক সময় চেপে ধরে রাখলে এটা ছোটো হয়ে যায়। এর আরেক নাম ক্যারোটিড বডি টিউমার। অন্য সব টিউমারের মতো কেমোডেকটোমার বায়োপসি বা এফ,এন,এ,সি করা যায়না। ক্যারোটিড এনজিওগ্রাম বা এম,আর,আই করে এর উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হয়। কেমোডেকটোমার একমাত্র চিকিৎসা হলো সার্জারি। রোগীর বয়স বেশী হলে অবশ্য সার্জারি না করানই ভালো। এর অপারেশন বেশ ঝুকিপূর্ণ, তাই অভিজ্ঞ ভাসকুলার সার্জন দ্বারা এর অপারেশন করানো উচিত।

লাডউয়িগ এনজিনা (Ludwig’s Angina)

এনজিনা শব্দটি শুনলে আমরা অনেকেই ভাবি এটা বুঝি বুকে ব্যথা বা হৃদপিন্ডের ব্যথা। লাডউয়িগ এনজিনা আসলে তেমন কিছু নয়তবে এটাতেও ব্যথা হয় এবং সেটা বুকে নয় বরং মুখে। এটা স্ট্রেপটোকক্কাস নামক একটি ব্যাকটেরিয়া জনিত মুখগহ্বরের সেলুলাইটিস (Cellulitis) জাতীয় একটি ইনফেকশনথুতনির কাছে বাদামি হয়ে যাওয়া এবং মুখের ভেতর ফুলে যাওয়া সেই সাথে মুখে তীব্র দুর্গন্ধ হওয়া এসবই এই রোগের লক্ষন। এ রোগে অনেক সময় রোগীর ঢোক গিলতে অসুবিধা হয় এবং শ্বাস নিতেও অসুবিধা হতে পারে। এমন হলে রোগীকে অবশই নাক,কান,গলা বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এর কাছে যেতে হবে। অনেক সময় শিরায় এন্টিবায়োটিক অসুধ ব্যবহারেই এই রোগ ভালো হয়ে যায়। তবে রোগটি আরো জটিল হয়ে গেলে অপারেশন এর প্রয়োজন হতে পারে। লোকাল এনেসথেসিয়া দিয়ে শুধু ঐ স্থানটি অবশ করে থুতনির নিচে সামান্য অংশ কেটে এই অপারেশন করা হয়। বেশী জটিল হলে রোগীর গলার ভেতরে নলও দেয়া (Tracheostomoy) লাগতে পারে।

চোখ ওঠা বা কনজাঙ্কটিভাইটিস

চোখের গোলকের সাদা অংশ এবং চোখের পাতার ভিতরের অংশ পাতলা একটি স্বচ্ছ পর্দা দিয়ে ঘেরা থাকে যার নাম কনজাঙ্কটিভা (Conjunctiva) আর এর প্রদাহ বা inflammation ই হলো চোখ ওঠা বা কনজাঙ্কটিভাইটিস। আমাদের সমাজে এটি খুবই একটি পরিচিত রোগ যার বহুবিধ চিকিতসা পদ্ধতি অল্পবিস্তর সবাই জানেন।
আমরা আশেপাশে যে কনজাঙ্কটিভাইটিস এর রোগীদের দেখে থাকি সেটা সচরাচর ভাইরাসের আক্রমনে হয় তবে বিভিন্ন ধরনের ব্যাকটেরিয়া, এলার্জী বা আঘাত পাবার কারনেও এ রোগ হতে পারে। যেকোনো বয়সের নারী পুরুষের এ রোগটি যেকোনো সময় হতে পারে তবে অপরিস্কার বা নোংরা জীবন যাপন পদ্ধতি এরোগ হতে সহায়ক ভূমিকা রাখে।
চোখ ওঠা রোগে যে চোখ লাল হয়ে যায় এটা কিন্ত সবাই জানেন আর এমনটি হয় এই কনজাঙ্কটিভার রক্তনালীগুলো প্রদাহর কারনে ফুলে বড় হয়ে যাওয়া এবং তাতে রক্তপ্রবাহ বেড়ে যাবার কারনে। ঘুম থেকে উঠলে চোখ আঠা আঠা লাগা, সব সময় চোখের ভেতর কিছু একটা পড়েছে এমন অনুভূতি, চোখ চুলকানো এবং জ্বালাপোড়া করা, আলোর দিকে তাকালে অস্বস্তি লাগা, সবকিছু ঘোলা ঘোলা দেখা, চোখ দিয়ে পানি পরা, চোখের কোনায় ময়লা (যা কেতুর নামে প্রচলিত) জমা, চোখ ফুলে যাওয়া ইত্যাদি সব ই রোগের লক্ষন।
কনজাঙ্কটিভাইটিস প্রথমে এক চোখে হয় এরপর তা অন্য চোখে ছড়িয়ে পরে এজন্য অন্য চোখটিকে সংক্রমিত হতে না দেয়া চিকিতসার একটি উদ্দেশ্য। এজন্য রোগিকে অসুস্থ চোখের পাশে কাত হয়ে শুতে বলা হয়। এছাড়া চোখে বার বার হাত না দেয়া বা চোখ না কচকানো, বার বার পানি দিয়ে না ধোয়া, কালো চশমা পড়া ইত্যাদি উপদেশ রোগটির বৃদ্ধি নিয়ন্ত্রনে সাহাহ্য করে।
এ রোগে চক্ষু বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে জেনে নেয়া উচিত রোগের কারন কি এবং এখন কি করনিয়। আরো খারাপ কোনো ইনফেকশন এর হাত থেকে বাচাতে বা এই ইনফেকশন সারাতে এন্টিবায়োটিক ড্রপ দিতে হলে তিনিই দিবেন। অপচিকিৎসা করা হলে রোগটি জটিল আকার ধারন করে চোখের ব্যপক ক্ষতি করতে পারে।

চোখে ছানি পরা

ক্যামেরার লেন্সের (Lens) মতো আমাদের চোখের ভেতরেও একটি লেন্স রয়েছে যাকে সংকোচিত ও প্রসারিত করার মাধ্যমে আমরা যথাক্রমে দুরের ও কাছের জিনিসকে স্পষ্ট দেখতে পাই। এই লেন্সটি অস্বচ্ছ হয়ে গেলে আমরা চোখে ঝাপসা দেখি এমনকি কোনো কোনো সময় কিছুই দেখতে পাইনা। লেন্সের এই ঝাপসা হয়ে যাওয়া রোগটির নামই ছানি পড়া বা ক্যাটারাক্ট (Cararact)। বৃদ্ধ বয়সে যত লোক অন্ধ হয়ে যায় তার বেশীর ভাগই হয় চোখে ছানি পড়ারকারনে। মনে রাখতে হবে এই অন্ধত্ব স্থায়ী নয়, সঠিক সময়ে চিকিৎসা করালে এই রোগী আবার দৃষ্টি ফিরে পাবে।
অনেক সময় জন্মগত ভাবেও শিশুছানি পরা চোখ নিয়ে জন্মাতে পারে তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এই রোগটি বৃদ্ধ বয়সে হতে দেখা যায়। সাধারনত ৫০ বছর বয়সে এই রোগটি হতে শুরু করে। তবে এর আগে যে হতে পারেনা তা নয়। ডায়াবেটিস রোগীদের রক্তের সুগার অনিয়ন্ত্রিত থাকলে এ রোগ হবার সুযোগ অনেক বেশী থাকে। অনেক সময় চোখে আঘাত পেলে, রেডিয়েশনের কারনে, চোখে কোন কেমিক্যাল লাগলে কিংবা বিদ্যুতায়িত হবার কারনেও এই রোগ অল্প বয়সে হতে পারে।
চোখে ছানি পরা শুরু করলে রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে সবকিছু ঝাপসা দেখা যায়, অনেক সময় কোনো জিনিসের দুইটি করে প্রতিবিম্ব দেখা যায়। কখনো কখনো আবার চোখে রংধনুর সাত রঙ ভেসে উঠে। এসব রোগীরা সাধারনত সন্ধ্যায় বা রাতের অন্ধকারে কিছুটা ভালো দেখে। তবে ছানি যখন পরিপক্ক হয়ে যায় রোগী তখন তার দৃষ্টি ক্ষমতা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলে।
ক্যটারাক্ট বা চোখের ছানির চিকিৎসা অবশ্যই একজন চক্ষুবিশেষজ্ঞের (Opthalmologist)তত্ত্বাবধানে করাতে হবে। রোগের প্রাথমিক পর্যায়ে কালোচশমা বা সানগ্লাশ পড়লে রোগীর দৃষ্টির কিছুটা উন্নতি হয়, চোখে এট্রপিন জাতীয় ড্রপ ব্যবহার ও এতে কিছুটা সাহায্য করে থাকে। ছানি পরিপক্ক হয়ে গেলে অপারেশনই এর একমাত্র চিকিৎসা। অপারেশন করে চোখের ভেতর লেন্স লাগিয়ে নিলে রোগী আবার পূর্বের মতো দেখতে পারে। ফ্যাকো সার্জারির মতো আধুনিক সার্জারি চোখের ছানি পরা রোগটির চিকিৎসা আরো সহজ, ঝামেলামুক্ত ও ফলপ্রসু করে তুলেছে।

চোখে কোনো কিছু পড়া

কোনো কিছু চোখের দিকে এগিয়ে আসার সময় চোখের পাতা খুব দ্রুত বন্ধ হয়ে যাওয়া সত্ত্বেও আমাদের চোখে অনেক ধরনের ছোটোখাটো পদার্থ প্রবেশ করতে পারে। মূলত ধুলোকনাকীট পতঙ্গছোট ইট পাথর বা কাঠের টুকরা থেকে শুরু করে সুইবাশছোটো খেলার বল নানা কিছু আছে এই তালিকায়। এসব কে এক কথায় ফরেন বডি (Foreign body) বলা হয়। এসবের কারনে আমাদের চোখে প্রথমে খচখচে একটা অনুভুতি হয় যা বেশ পীড়া দায়ক। দ্রুত বের করে নেয়া না হলে এসব ফরেন বডি কর্নিয়ায় ঘষা লেগে চোখের প্রভুত ক্ষতি করতে পারেক্ষতির এক পর্যায়ে চোখ অন্ধ হয়ে যাওয়াও অস্বাভাবিক নয়।
অনেক সময় এসব ফরেন বডি এতো ছোট হয় যে খালি চোখে এদের দেখাও যায়নাতাই চোখে কোনোকিছু পড়ার পরে যখন খচখচ করার মত অনুভুতি হয়চোখ দিয়ে অবিরত পানি পড়েতাকালে চোখজ্বালা করে এবং চোখ বন্ধ রাখলে আরাম হয়চোখ লাল হয়ে যায় তখন ধরে নিতে হবে চোখের পাতাএবং কর্নিয়া বা স্ক্লেরার মাঝে কোনো ফরেন বডি আটকে আছে
এমন অনুভুতি হলে সবাই, বিশেষ করে বাচ্চারা খুব ঘন ঘন চোখ কচকাতে বা চুলকাতে থাকেএমন কাজটি একেবারেই করা যাবেনা। দেখা যায় এমন সহজ কিছু পড়ে থাকলে কটন বাড (Cotton bud) বা তুলো একটু পেচিয়ে অন্যের সাহায্য নিয়ে আলতো করে বের করে আনার চেষ্টা করতে হবে। বের করে আনা গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী এনটিবায়োটিক মলম ও ব্যান্ডেজ প্যাড দিয়ে একদিন ঐ চোখ ঢেকে রাখাটাই উত্তম। ফরেন বডি বের করা না গেলে বা চোখে ফুটো হয়ে গেলে বা ক্ষতিকর কিছু পড়লে দ্রুত চক্ষু হাসপাতালে অথবা চক্ষু বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করা উচিত।

দুরদৃষ্টির সমস্যা

আমাদের চোখের ভেতরে ক্যামেরার মতো যে লেন্স (Lens) আছে তা অনেক সময় ঠিকমতো সংকোচিত হতে না পারলে আমরা দুরের অনেক জিনিস স্পষ্ট দেখতে পাইনা। এই রোগটির নাম মায়োপিয়া বা দুরদৃষ্টি। এই রোগে কাছের কোনো জিনিস দেখতে কোন অসুবিধা হয়না। সাধারণত মাথা ব্যথা বা এই জাতীয় সমস্যা নিয়ে রোগীকে এই রোগে অভিযোগ করতে শোন যায়না।
বয়স্ক লোকদের তুলনায় কমবয়সী লোকজনেরই এই রোগটি বেশী হতে দেখা যায়। অনেক সময় জন্মগত কারনেও এটি হতে পারে। চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গেলে এই রোগটি আছে কিনা তা তিনিRetinoscopy পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করেন।
চোখে শুধুমাত্র Myopia রোগ থাকলে চশমায় একটি অবতল লেন্স (Concave lens)ব্যবহার করে চোখের এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করে চশমা ব্যবহার না করেও এই সমস্যার হাত থেকে রেহাই মেলে।

নিকটদৃষ্টির সমস্যা

আমাদের চোখের ভেতরে ক্যামেরার মতো যে লেন্স (Lens) আছে তা অনেক সময় ঠিকমতোপ্রসারিত হতে না পারলে আমদের কাছের জিনিস দেখতে অনেক সময় কষ্ট হয়। এই রোগটির নাম হাইপারমেট্রোপিয়া বা হ্রস্বদৃষ্টি। এই রোগে দূরের কোনো জিনিস দেখতে কোন অসুবিধা হয়না।
যেতেতু কাছের জিনিস দেখতে অসুবিধা হয় তাই অনেকেই কষ্ট করে বই বা লেখা কাগজ চোখের কাছে এনে পড়া শুরু করেন ফলে তিনি প্রথম দিকে টের পাননা যে তার চোখের দৃষ্টিতে কোনো সমস্যা আছে। অনেক্ষন ধরে চোখে চাপ লাগিয়ে পড়ার জন্য অনেক সময় চোখে ব্যথা হতে পারে। মাথা ব্যথা এই রোগের রোগীদের খুব পরিচিত একটা অভিযোগ।
চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে গেলে এই রোগটি আছে কিনা তা তিনি Retinoscopy পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত করেন। চোখে শুধুমাত্র Hypermetropia রোগ থাকলে চশমায় একটি উত্তল (Convex) লেন্স ব্যবহার করে চোখের এই সমস্যা থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। কন্টাক্ট লেন্স ব্যবহার করে চশমা ব্যবহার না করেও এই সমস্যার হাত থেকে রেহাই মেলে।

স্ট্রোক (Stroke)

স্ট্রোক (Stroke) রোগটির নাম শুনলে যদিও হার্ট এটাক এর কথা মনে আসে, স্ট্রোক আসলে মস্তিস্কের রোগ। মস্তিস্কের কোনো স্থানের রক্ত নালী বন্ধ হয়ে গেলে বা ব্লক হলে ঐ স্থানের রক্ত প্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়,ফলে মস্তিস্কের ঐ বিশেষ এলাকা কাজ করতে পারেনা। এটিই স্ট্রোক রোগ। মস্তিস্কের ঐ বিশেষ এলাকাটি শরীরের যে যে অংশকে নিয়ন্ত্রন করতো স্ট্রোক হলে সে সকল অংশের বিভিন্ন অংগ বিকল হয়ে পরে।
মস্তিস্কের এক দিক নস্ট হলে শরীরের উল্টো দিক বিকল হয়ে পরে। অর্থাৎ মস্তিস্কের বাম দিকে ক্ষতি হলে শরীরের ডান দিক অচল/অবশ হয়ে যায়।
স্ট্রোক হবার পর এরকম শরীরের এক দিক অচল হবার নাম হেমিপ্লেজিয়া (hemiplegia) আর অবশ হলে বলে হেমিপেরেসিস (hemiparesis)। স্ট্রোক হলেই যে শরীরের কোনো পাশ চিরতরে অচল হয়ে যাবে তা কিন্ত নয়। কিছু ধরনের স্ট্রোক হলে সাময়িক কিছু অসুবিধার পরে মানুষ আবার পুরোপুরি সুস্থ্য হয়ে যায়।
হাইপারটেনশন বা উচ্চ রক্ত চাপ, ধুমপান করা, অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি, অতিরিক্ত এলকোহল সেবন ইত্যাদি স্ট্রোকের ঝুকি বহুগুনে বাড়িয়ে থাকে। আগেই বলা হয়েছে যে স্ট্রোক হয় মস্তিস্কের রক্ত নালী বন্ধ হবার কারণে তাই বোঝাই যায় যে যে কারণে রক্তনালী বন্ধ হয় সেই সেই কারণে স্ট্রোক হয়, যেমন ধমণীতে চর্বি বা ক্যালসিয়াম জমা, টিউমার হওয়া, ধমণীর প্রদাহ জনিত রোগ ইত্যাদি। এছাড়াও হার্ট বা অন্য ধমণী থেকে জমাট রক্ত ছুটে গিয়ে বা মাথায় আঘাত পাবার কারনেও স্ট্রোক হতে পারে।
স্ট্রোক হলে মাথা ব্যাথা, বমি বমি ভাব অথবা বমি হওয়া তো হয়ই সেই সাথে কোনো একপাশের হাত-পা অবশ পা অচল হয়ে যাওয়া, বোধহীন হয়ে যাওয়া, বাকরুদ্ধ হওয়া, কথা জড়িয়ে আসা, জ্ঞান হারানো ইত্যাদি উপসর্গ গুলোও দেখা দেয়। বড় ধরনের স্ট্রোক হলে চার হাত-পা ই অবশ বা অচল হয়ে যেতে পারে।
স্ট্রোক এর রোগীকে মস্তিস্কের সিটি স্ক্যান (CT scan) পরীক্ষাটি করতেই হয়, এটি দ্বারা ঠিক কোথায় ক্ষতি হয়েছে বোঝা যায়,  মস্তিস্কের  এঞ্জিওগ্রাম (Angiogram) করেও এটা বোঝা লাগতে পারে। অনেক সময় কারন বের করতে ইকোকার্ডিওগ্রাম (Echocardiogram) ও করা লাগে, সেই  সাথে যে সকল রোগ স্ট্রোক এর ঝুকি বাড়ায় রক্তসহ বিভিন্ন পরীক্ষা করে সে সকল রোগের উপস্থিতি ও অবস্থাও জেনে নিতে হয়।
স্ট্রোক রোগীর চিকিৎসা অবশ্যই একজন নিউরোলজিস্ট (Neurologist) বা স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞের তত্ত্বাবধানে করানো উচিত। এই রোগের সুনির্দিষ্ট এমন কোনো চিকিৎসা নেই যাতে রোগী সাথে সাথে চিরতরে ভালো হয়ে যাবে। ধৈর্য্য ধরে রোগীর সেবা করতে হবে, সঠিক পুষ্টি ও তরল সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, ঝুকি আছে এমন রোগ গুলো নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এর পর সবচেয়ে বেশী যেটা প্রয়োজন তা হলো ফিজিওথেরাপি (Physiotherapy) । তবে স্ট্রোক এর অবস্থা বুঝে এর সাথে আরো অন্য চিকিৎসাও যোগ করতে হতে পারে যা অবশ্যই একজন নিউরোলজিস্ট বিবেচনা ক
রবেন।

আলঝেইমার’স ডিজিজ (Alzheimer’s disease)

মানুষ বৃদ্ধ হলে স্মরণ শক্তি কমে যায় (dementia) এটা আমাদের মাঝে খুবই প্রচলিত একটি ধারণা। ধারনাটা যে খুব একটা ভুল তাও কিন্ত নয়। ৪৫ বৎসর বয়সের পর বিশাল অংশের একদল লোকের স্মরণ শক্তি কমে যেতে শুরু করে এবং বয়স বাড়ার সাথে সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে সব কিছু ভুলে যাবার প্রবণতাও। এই ধরণের বুদ্ধিবৈকল্য বা স্মৃতি শক্তি কমে যাওয়ার কারণ যে সকল রোগ তার প্রধান রোগটির নাম আলঝেইমারস রোগ। ১৯০৬ সালে জার্মান মনোচিকিৎসক Alois Alzheimer সর্বপ্রথম এ রোগটির বর্ণনা দেন, আর তার নাম অনুসারেই এ রোগের এমন নাম রাখা হয়।
এ রোগের সঠিক কারণ কি তা কিন্ত এখন ও জানা যায়নি তবে সাম্প্রতিক গবেষনা গুলো দাবী করছে; যে সকল উপাদান বা নিউরোট্রান্সমিটার (neurotransmiter) এর আদান প্রদান এর মাধ্যমে মস্তিস্ক তাদের কার্য সম্পাদন করে তাদের সমস্যার কারণেই এই রোগটি হয়ে থাকে। পরিসংখান অনুযায়ী শতকরা ১৫ ভাগ রোগীই এ রোগে আক্রান্ত হন পারিবারিক উত্তরাধিকার সূত্রে (familial inheritance), আর শতকরা ১ থেকে ৫ শতাংশ রোগের কারন হলো জেনেটিক (genetic)। এ রোগ হলে মস্তিস্কের পরিমান ছোট (atrophy) হয়ে আসতে থাকে, বিশেষ করে সেরিব্রাল কর্টেক্স (cerebral cortex) এবং হিপোক্যাম্পাস (hippocampus) উল্লেখযোগ্য ভাবে আকারে কমতে (atrophy) থাকে।
আগেই বলেছি আলঝেইমারস রোগ হলে রোগীর স্মৃতি শক্তি কমে যেতে শুরু করে। রোগী সাম্প্রতিক(short term) এবং অতীত (long term) দুই ধরণের স্মৃতিই বিস্মৃত হয়ে যান, যদিও সাম্প্রতিক ঘটনা গুলো ভুলে যাবার হারটাই অধিক। এছাড়া এ সকল রোগীর মাঝে দ্বিধা (confusion), খিটখিটে স্বভাব(irritation), উদ্ধ্যত ভাব (aggression), বিষন্নতা-অবসাদ, বাকশক্তিহীনতা বা অন্যের কথা বোঝার ক্ষমতা লোপ পাওয়া (aphasia) সহ নানাবিধ সমস্যা দেখা দেয়। দুর্ভাগ্যজনক ভাবে তিনি তার এই সমস্যা গুলো বুঝতে পারেন না এমন কি তার মনে এ বিশ্বাস জন্মায় যে তার এ ধরনের কোন সমস্যাই নেই। এর ফলে অনেক সময়ই ব্যক্তিটি পারিবারিক ভুলবোঝাবুঝির শিকার হন এবং পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে তার একটি বৈরি সম্পর্ক তৈরী হয়; ফলস্বরূপ তিনি চরম একাকীত্বে ভুগতে থাকেন।
এমন রোগ হলে পরিবারের প্রবীণ সদস্যটিকে একজন নিউরোবিশেষজ্ঞের নিকট নিয়ে যাওয়া উচিত। সাধারণত চিকিৎসক সাহেব রোগীর ইতিহাস জেনে এবং তার আত্মীয়দের সাথে কথা বলেই রোগটি নিশ্চিত করতে পারেন। তবে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় সিটি স্ক্যান (CT scan), এম-আর-আই(MRI), স্পেক্ট (SPECT-single photon emission computed tomography), পেট স্ক্যান (PET-positron emission tomography) এসব পরীক্ষা করে অনেক সময় নিশ্চিত হতে হয় রোগীর এর সাথে মস্তিস্কের অন্য কোন রোগ আছে কিনা।
দুর্ভাগ্যজনক হলো আলঝেইমার রোগের এখনো সঠিক কোন চিকিৎসা আবিষ্কার করা সম্ভব হয়ে উঠেনি। তবে পরিবারের আপনজনেরা সহানুভুতিশীল হলে এবং সহমর্মিতা সহ ব্যক্তিটিকে একটি সঠিক স্নেহময় পরিবেশ তৈরী করে দিলে তার জন্য একটি অর্থবহ জীবন যাপন সম্ভবপর হয়ে উঠতে পারে।
বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা যায় যে, যেসকল ব্যক্তি মধ্যবয়সে বিভিন্ন বুদ্ধিভিত্তিক কাজ (যেমন লেখালেখি, বইপড়া, যন্ত্রসংগীত বাজানো), বিভিন্ন সামাজিক গঠন/সেবামূলক কাজ, Board game খেলা (দাবা,cross word puzzle) ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত থাকেন এবং স্বাস্থ্যকর খাবার খান তাদের মাঝে এ রোগ হবার প্রবণতা কম। অন্যদিকে যারা অনিয়ন্ত্রিত কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ রোগে ভোগেন বা ধুমপায়ী তাদের মধ্যে এ রোগ হবার প্রবণতা অপেক্ষাকৃত ভাবে বেশী।
উৎসাহের কথা হলো অতিসম্প্রতি আলঝেইমার রোগের উপশমে DONEPEZIL, GALANTAMINE, MEMANTINE, RIVASTIGMINE নামক কিছু অসুধ আবিস্কৃত হয়েছে। এদের কার্যকারীতা শতভাগ না হলেও অনেক ক্ষেত্রেই এরা রোগ উপশমে আশানুরূপ প্রমাণ রেখেছে। তবে বাস্তবতা হলো এই যে বার্ধক্যে উপনীত হলে আমরা যে কেউই এমন একটি রোগের শিকার হয়ে উঠতে পারি, তাই আমাদের সকলের উচিত এমন রোগীদের সহানুভুতির দৃষ্টিতে দেখা এবং আমাদের নিজেদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে একটা সুন্দর  পৃথিবীর পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়াস অব্যাহত রাখা।

টি আই এ TIA (Transient Ischemic Attack)

খুব সহজ বাংলায় বলতে গেলে টি,আই,এ হলো সাময়িক ব্রেইন স্ট্রোক (brain stroke )। ব্রেইন স্ট্রোক হলে যে উপসর্গগুলো মাসের পর মাস কিংবা কোন কোন ক্ষেত্রে সারা জীবনের জন্য স্থায়ী হয়ে যায়, টি,আই,এ হলে তার উপস্থিতি থাকে মিনিটখানেকের জন্য, কখনো সখনো হয়তোবা পুরো একদিন। কারো টি,আই,এ হলে তিনি হঠাৎ করে সাময়িক ভাবে দৃষ্টি হারিয়ে ফেলতে পারেন এমনকি কিছু সময়ের জন্য ভারসাম্য হারিয়ে অজ্ঞান হয়ে যাওয়াটাও এর আওতার মধ্যেই পরে। তবে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই হঠাৎ দৃষ্টি হারিয়ে ফেলা, কথা জড়িয়ে যাওয়া, শরীরের একপাশ অবশ বা দূর্বল হয়ে যাওয়া, জীহবা (tongue) ভারী ভারী লাগা এসব লক্ষনের মধ্যে টি,আই,এ সীমাবদ্ধ থাকে। রোগী এই মুহুর্তগুলোর পর আবার সতস্ফুর্ত ভাবেই স্বাভাবিক হয়ে উঠেন।
সাধারণত যাদের অনিয়ন্ত্রিত উচ্চরক্তচাপ (Hypertension), ডায়াবেটিস (diabetes) থাকে, কিংবা যারা নিয়মিত ধুমপান করেন, যাদের পরিবারে স্ট্রোকের ইতিহাস আছে এমন লোকজনই টি,আই,এ রোগে বেশী আক্রান্ত হয়ে থাকেন। তবে পুরুষদের বয়স ৫৫ এর বেশী হলে এ রোগের প্রবণতার হার বেড়ে যেতে পারে।
যে সকল কারণে ব্রেইন স্ট্রোক হয় তার সবগুলোই টি,আই,এ হওয়ার কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে মস্তিস্কের রক্তনালী সরু হয়ে যাওয়া হলো এর প্রধান কারণ। ধুমপান, উচ্চরক্তচাপ, রক্তে চর্বির (Lipid)পরিমান বেড়ে যাওয়া, অনিয়ন্ত্রিত ক্রনিক ডায়াবেটিস, অপরিমিত শারীরিক / কায়িক পরিশ্রম ইত্যাদি কারণেই সাধারনত মস্তিষ্ক, হৃদপিন্ড অথবা শরীরের অন্য কোন স্থানের রক্তনালী সরু হয়ে যেতে পারে। এই অসুস্থ রক্তনালীর কোন অংশ থেকে ছুটে আসা কোন ক্ষুদ্র দুষিত অংশ (embolus) ছুটে এসে যদি ব্রেইন এর ধমনী/রক্তনালী তে আটকে যায় তাহলেই টি,আই,এ হয়। তবে হৃদপিন্ডের অনিয়মিত স্পন্দন জনিত রোগ (arrhythmia, atrial fibrillation) এর কারনেও টি,আই,এ হতে পারে।
এমন রোগে আক্রান্ত হলে সাথে সাথেই একজন স্নায়ুরোগ বিশেষজ্ঞ বা নিউরোলজিষ্ট (neurologist)এর স্মরণাপন্ন হওয়া উচিত। রোগীর ইতিহাস জেনে এবং কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা করে তিনি নিশ্চিত হতে পারেন রোগটি টি,আই,এ কিনা। তবে এর কারণ অনুসন্ধানের জন্য এবং ভবিষ্যতে এর প্রকোপ থেকে মুক্তির জন্য ব্রেইন এর সিটি স্ক্যান (CT scan), এম,আর,আই (MRI), ই,সি,জি (ECG), ইকোকার্ডিওগ্রাম(Echocardiogram), রক্তে চর্বির পরিমান জানা (Lipid profile) অন্যান্য পরীক্ষাও করানো হয়ে থাকে। টি,আই,এ হলে প্রথমেই রোগীর উচ্চরক্তচাপ, ডায়াবেটিস, রক্তের চর্বির পরিমান খুব দ্রুত নিয়ন্ত্রনে নিয়ে আসতে হয়। সেই সাথে রোগীকে রক্ত পাতলা রাখার প্রয়োজনীয় কিছু অসুধ ও প্রদান করা হয়। তবে এ সব কিছুই একজন নিউরোলজিষ্টের এখতিয়ারে পরে, তিনিই এ ব্যাপারে চুড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেন। তবে কোনো ক্ষেত্রে বার বার টি,আই,এ/স্ট্রোক হবার ঝুকি থাকলে মস্তিস্কের রক্তপ্রবাহের ধমনীর (carotic artery) অপারেশন (carotid endarterectomy)ও করানোর প্রয়োজন হতে পারে।
একটা কথা মনে রাখা খুব জরুরী তা হলো টি,আই,এ ব্রেইন স্ট্রোক হবার একটি চুড়ান্ত পূর্বাভাস। যাদের একবার টি,আই,এ হয় তাদের এক তৃতীয়াংশের আবার টি,আই,এ হবার সম্ভাবনা থাকে এবং ১০% রোগীর ব্রেইন স্ট্রোক হবার সম্ভাবনা ব্যাপক। তাই চিকিৎসা নেয়ার পাশাপাশি রোগীকে অবশ্যই জীবন যাপন পদ্ধতিতে শুদ্ধি অভিযান চালাতে হবে, চিরতরে ধুমপান ত্যাগ করা, উচ্চরক্তচাপ ও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রনে রাখা, নিয়মিত হাল্কা পরিশ্রম করা, খাদ্যে পরিমিত লবন খাওয়া, ওজন নিয়ন্ত্রনে রাখা ইত্যাদি সু অভ্যাস গঠন টি,আই,এ হবার হার কমিয়ে আনার জন্য যথেষ্ট সহায়ক। তাই এই ঝুকির মানুষগুলো এসব ব্যাপারে যত্নবান হলে পক্ষাঘাতগ্রস্থ হয়ে অন্যের বোঝা হওয়ার হাত থেকে সহজেই নিজেকে বাঁচাতে পারবেন বলে প্রত্যাশা করি।

মাইগ্রেইন (Migraine)

মাইগ্রেইন হলে তীব্র মাথা ব্যথা হয় যা সাধারণত মাথার একদিকে অথবা পিছনের দিকেঅনুভূত হয়তবে অনেক সময় চোখের চারপাশেও ব্যথা থাকতে পারে। এর সাথে প্রায় সময়ইবমি বমি ভাব থাকেকোনো কোনো সময় চোখেও সবকিছু ঝাপসা দেখা যায়। মাইগ্রেইনচক্রাকারে হতে থাকে অর্থাৎ একবার আসে আবার ভালো হয়ে যায় তারপর আবার আসে এবংএভাবে চলতেই থাকে।
বয়োঃসন্ধিতে প্রথম মাইগ্রেইন হতে দেখা যায় এবং তা বার্ধক্য হবার আগ পর্যন্ত চলতে পারে।অনেক সময়জন্মনিয়ন্ত্রনের বড়ি বা বিশেষ কোনো খাবার খেলে মাইগ্রেইন শুরু হয়এগুলো মাইগ্রেইন এরপ্রেসিপিটেটিং ফ্যাক্টর (Precipitating factor) নামে পরিচিত।
নিউরোলজিস্ট (Neurologist) এর তত্ত্বাবধানে মাইগ্রেইন এর চিকিৎসা করানো উচিত। মাইগ্রেইন হলেপ্যারাসিটামল জাতীয় অসুধ খেলে মাথা ব্যথা কমতে পারে। মাইগ্রেইন রোগীর উত্তেজনা নিয়ন্ত্রন করতেহবে সেই সাথে প্রেসিপিটেটিং ফ্যাক্টর পরিহার করতে হবে। ব্যথা খুব বেশী হলে নিউরোলজিস্টগণপ্রপানললএমিট্রিপ্টাইলিনমেথিসারজাইড ইত্যাদি অসুধ ব্যবহার করে থাকেন।